বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ২০২৫-২৬ বাজেটে প্রান্তিক খামারিদের জন্য ২০০০ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে। এটি ফিড ভর্তুকি, সুদমুক্ত ঋণ, কোল্ড স্টোরেজ, প্রশিক্ষণ ও বাজার সম্প্রসারণে ব্যয় হবে। খাতটি খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ। তীব্র তাপপ্রবাহে ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ড. মিহির কুমার রায়ঃ দেশের পোল্ট্রি খাতের উন্নয়নে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে প্রান্তিক খামারিদের জন্য দুই হাজার কোটি টাকা বাজেটের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ)। মোট ১০টি খাতে এ বাজেট প্রস্তাবনা তুলে ধরেন খামারিরা।গত১৬ই মে পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাত কৃষি-ভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ, যা সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত। এ খাতের মেরুদণ্ড হলো প্রান্তিক খামারিরা, যারা সীমিত মূলধন ও অবকাঠামো নিয়ে প্রতিদিন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডিম ও মুরগি উৎপাদন করে জাতিকে পুষ্টি জোগাচ্ছেন। অথচ এ পরিশ্রমী খামারিরাই প্রতিনিয়ত বাজারের অস্থিরতা, ফিড ও ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং করপোরেট সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কারণে টিকে থাকার লড়াইয়ে নিপতিত হচ্ছেন। বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) দেশের নিবন্ধিত প্রান্তিক খামারি ও ডিলারদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি জাতীয় সংগঠন হিসেবে এ খাতের টেকসই উন্নয়ন এবং খামারিদের অধিকার সুরক্ষায় একটি সমন্বিত ও বাস্তবমুখী বাজেট সুপারিশ পেশ করছে। দুই হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে পোল্ট্রি খাতের পুনরুত্থান, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং প্রান্তীক খামারিদের ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে।
এতে আরো বলা হয়, মোট দুই হাজার কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে ফিডে ভর্তুকিতে ৪০০ কোটি টাকা, ওষুধ ও ভ্যাকসিনে সহায়তায় ২০০ কোটি, সুদমুক্ত ও জামানতবিহীন ঋণে ৩০০ কোটি, সমবায় ভিত্তিক ফিড মিল ও হ্যাচারি স্থাপনে ৩০০ কোটি, আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিটে ৩০০ কোটি, ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ও অনলাইন মার্কেট প্লাটফর্মে ১০০ কোটি টাকা, প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে ১০০ কোটি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সহায়তায় ২০০ কোটি, অবকাঠামো উন্নয়নে ১০০ কোটি এবং প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ ও লাইভ বাজার নিয়ন্ত্রণে ১০০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হচ্ছে। বিজ্ঞপিতে আরো বলা হয়, প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুধু প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিদের জীবন ও জীবিকা রক্ষা করা যাবে না, বরং গোটা জাতির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি হবে। কারণ পোল্ট্রি খাত শুধু একটি কৃষি খাত নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকা শক্তি, খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম স্তম্ভ এবং দেশের কোটি মানুষের জীবিকার উৎস। এছাড়া খামারিরা যেন স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্মত প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি করতে পারেন, সেজন্য প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি সহায়তা ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা হবে। ধীরে ধীরে লাইভ মুরগির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কোল্ড চেইনের আওতায় প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বিপণনকে উৎসাহিত করা হবে।
বাংলাদশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) এর কর্মকর্তারা অরও জানান তীব্র তাপপ্রবাহে হিট স্ট্রোকে প্রান্তিক খামারে ৫ থেকে ১০ শতাংশ মুরগি মারা গেছে। এর ফলে ৭০ হাজার খামারির প্রতিদিন ৫০ থেকে ১ লাখ টাকা করে ক্ষতি হয়েছে। দিনে ৫০ হাজার টাকা ধরা হলেও গত এক মাসে প্রান্তিক খামারিদের লোকসান দাঁড়ায় ৩০০ কোটি টাকায়।সংগঠনের সভাপতি স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কাপাসিয়া, পাবনা, রাজশাহী, রংপুর, কক্সবাজার, কুমিল্লা, গাজীপুর, সাভার, কিশোরগাঞ্জ, ময়মনসিংহ, ফেনীসহ দেশের প্রায় সব জেলাতেই প্রান্তিক খামারিরা এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি। তীব্র তাপপ্রবাহ, লাগাতার লোডশেডিং ও বাজারে অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে হাজার হাজার মুরগি। ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির মৃত্যুর হার গড়ে ১০ শতাংশ এবং লেয়ার (ডিম পাড়া) মুরগির মৃত্যু ৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।এতে বলা হয়, ‘দেশে খামার রয়েছে ৬০ থেকে ৭০ হাজার, প্রতিটি খামারে কমপক্ষে ৫-১০ শতাংশ মুরগি মারা গিয়েছে। যার বাজারমূল্য ৫০ থেকে ১ লাখ টাকা। সে হিসাবে যদি প্রতিটি খামারে ক্ষতির পরিমাণ গড়ে ৫০ হাজার টাকা ধরা হয়, তাহলে লোকসানের পরিমাণ ৩০০ কোটি টাকা দাঁড়ায়। এতে প্রান্তিক খামারিরা পুঁজি হারিয়ে খামার বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে সামনের দিনগুলোতে ডিমের উৎপাদন কমবে ৫ শতাংশ এবং মাংস উৎপাদন কমবে ১০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ, যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। মাত্র ২০ শতাংশ ডিম ও মুরগি উৎপাদন করে যে করপোরেট কোম্পানিগুলো, সরকারের নজর সেখানেই সীমাবদ্ধ। অথচ দেশের ৮০ শতাংশ ডিম ও মুরগি উৎপাদন করেন প্রান্তিক খামারিরা—যাঁরা অবহেলার শিকার। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে তাঁদের অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে গেলেও কি সরকারের টনক নড়বে না? এভাবে চলতে থাকলে আগামী দিনে ৭০ থেকে ৮০ হাজার খামারি চরম ঋণের জালে পড়ে খামার বন্ধ করতে বাধ্য হবেন। প্রান্তিক খাতের এই বিপর্যয় সরাসরি হুমকির মুখে ফেলবে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান। তাই অবিলম্বে সরকারের উচিত প্রান্তিক খামারিদের দিকে নজর দেওয়া এবং করপোরেট সিন্ডিকেটের লাগাম টেনে ধরা। বারবার সতর্ক করার পরেও এই সেক্টর নিয়ে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা তাদের গভীরভাবে হতাশ করছে।’
বিপিএ এর মতে পোলট্রি খাতের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ফিড, এক দিন বয়সী বাচ্চা, ওষুধ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করছে; যা প্রান্তিক খামারিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন খরচ ক্রমাগত বাড়লেও তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। বিপিএ যখন খামারিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না অভিযোগ তুলেছে, তখন বাজারে ব্রয়লার মুরগির কেজি দুইশ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এরি মধ্যে ঢাকার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ১৯০ থেকে ২১০ টাকা দরে। সোনালি জাতের মুরগির কেজি ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকা। বিপিএ বলেছে, করপোরেট গ্রুপগুলোর পরিকল্পিত আধিপত্য বিস্তারের কারণে পোলট্রি খাত গভীর সংকটে পড়েছে। তাদের দৌরাত্ম্য এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দেশের প্রান্তিক খামারিরা খামার চালাতে পারবেন না।
বিপিএ সভাপতি বলেন, কিছু সরকারি অসাধু কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলার কারণেও পোলট্রি খাত বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহযোগিতা করার নামে তারা এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা প্রান্তিক খামারিদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করছে। তিনি বলেন, তাদের উৎপাদন খরচ ক্রমাগত বাড়ছে। তারা পণ্যের ন্যায্য দর পাচ্ছেন না। ফলে খামারিরা তাদের খামার বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ডিম ও মুরগির উৎপাদনে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, পোলট্রি খাতকে রক্ষা করতে হলে প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য দ্রুত পোলট্রি বোর্ড গঠন করতে হবে। এছাড়া প্রান্তিক খামারিদের জন্য সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ, প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, দামের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ফিড ও ডিওসির দাম নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। পাশাপাশি অসাধু কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
পোলট্রি খাত বিপর্যয়ের আরও একটি কারন বার্ড ফ্লু বা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা প্রধানত পাখিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এটি পোলট্রি শিল্পের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করতে পারে এবং কখনো কখনো মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীতে সংক্রমিত হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে বার্ড ফ্লু সংক্রমণ বেড়ে চলেছে, যা পোলট্রি খামারিদের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের মার্চে যশোর জেলার একটি মুরগির খামারে বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত খামারে প্রায় ৩ হাজার ৯৭৮টি মুরগির মধ্যে ১ হাজার ৯০০টি মারা গেছে এবং বাকি মুরগিগুলো সতর্কতামূলকভাবে মেরে ফেলা হয়েছে। ২০১৮ সালের পর এটিই প্রথম বাংলাদেশে বড় আকারে বার্ড ফ্লু সংক্রমণের ঘটনা। এ সংক্রমণের ফলে পোলট্রি শিল্পসংশ্লিষ্টরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। বার্ড ফ্লু বাংলাদেশের জন্য একটি বড় স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তবে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পোলট্রি খাতে বায়োসিকিউরিটি, সচেতনতা বৃদ্ধি, টিকা প্রয়োগ, বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং সরকারি নজরদারি বৃদ্ধি করলে বার্ড ফ্লুর প্রভাব কমানো সম্ভব। জনসচেতনতা ও সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে বাংলাদেশ বার্ড ফ্লুর ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে পারে, যা স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) সরকারের সহায়তা চেয়ে অনুরোধ জানিয়েছে এবং খামারিদের অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। আগামী বছরের বাজেটে এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে কিকেচনার জন্য প্রত্যাশা রইল ।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও সাবেক ডিন, সিটি ইউনির্ভাসিটি, ঢাকা ও সাবেক জ্যেষ্ঠ সহ–সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবীদ সমিতি, ঢাকা

