Site icon dbarta24.com

ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও করোনা: ভয়ংকর ত্রিমুখী আক্রমণে বাংলাদেশ!

খায়রুল আলম: বাংলাদেশ এখন এক নতুন স্বাস্থ্য সংকটের মুখে। একদিকে যেমন প্রতি বছর ডেঙ্গু আর চিকুনগুনিয়া আতঙ্ক নিয়ে হাজির হয়, তেমনি এবার এর সাথে যুক্ত হয়েছে করোনার নতুন উপধরন। রাজধানীসহ সারা দেশে ভাইরাসজনিত জ্বরের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

এই ত্রিমুখী আক্রমণ আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বহুমুখী চাপ সৃষ্টি করছে। আজ আমরা এই পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব এবং জানব, কীভাবে আপনি নিজেকে ও আপনার পরিবারকে সুরক্ষিত রাখবেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সময়কালকে ভাইরাস জ্বরের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল হিসাবে বিবেচনা করা হয়। মঙ্গলবার বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে (বিএমইউ) অনুষ্ঠিত এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

এই সেমিনারে জানানো হয়, হাসপাতাল ও বহির্বিভাগে ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এর ফলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর যে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তা যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এক্ষেত্রে চিকিৎসা খাতে প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।

সেমিনারে বিএমইউর মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবেদ হোসেন খান ‘রিসেন্ট ট্রেন্ড ইন ফেব্রাইল ইলনেসেস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, বর্তমানে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও করোনা – এই তিন ভাইরাসই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণ দেখা গেছে বরিশাল ও বরগুনায়।

চলতি মাসের সোমবার পর্যন্ত, অর্থাৎ খুব সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে, ১ হাজার ৮৭৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। দুঃখজনক খবর হলো, চলতি সপ্তাহেই বরিশালে ৫ জন এবং ঢাকায় দুজন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩৯৪ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। যদিও এই সময়ে ডেঙ্গুতে দেশে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি, যা কিছুটা স্বস্তির। তবে রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলাটা চিন্তার কারণ।

গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি রোগীদের মধ্যে বরিশাল বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৫৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৫৮ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩৫ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৫০ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৪২ জন, খুলনা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৮ জন, রাজশাহী বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৪৪ জন রয়েছেন। এটি স্পষ্ট করে যে, ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নেই, বরং সারা দেশেই এর বিস্তার ঘটছে।

এখন পর্যন্ত, চলতি বছর মোট ৮ হাজার ৫৪৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে, ৭ হাজার ৪৩০ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন।

ডা. আবেদ হোসেন খান আরও জানান, বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ডেন-১, ডেন-২ এবং ডেন-৩ সেরোটাইপ সক্রিয় পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, একাধিক ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস একসঙ্গে কাজ করছে, যা সংক্রমণকে আরও জটিল করে তুলছে।

এই সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণগুলো হলো: অপরিকল্পিত নগরায়ণ, মশা নিয়ন্ত্রণে অব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। অবাক করা বিষয় হলো, এবার ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সি তরুণদের মধ্যেও সংক্রমণের হার বাড়ছে, যা অতীতে তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এটি নির্দেশ করে যে, ডেঙ্গুর ধরন এবং এর শিকার হওয়া মানুষের বয়সসীমাতেও পরিবর্তন আসছে।

ডেঙ্গুর পাশাপাশি, চিকুনগুনিয়াও আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ডা. আবেদ হোসেন খান জানান, দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা নিয়ে দেশে উপেক্ষিত এই ভাইরাস জ্বর ফিরে আসছে। ২০১৭ সালের পর আবারও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গত বছরের ১৯ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ২২ এপ্রিল পর্যন্ত ৫২০ জন সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে ১৬১ জন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।

চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যুর হার কম হলেও, রোগের পরে গেঁটেব্যথা, র‌্যাশ, দুর্বলতা – এমন উপসর্গগুলো দীর্ঘমেয়াদে রোগীর জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই এটিকে সাধারণ ভাইরাস জ্বর ভেবে অবহেলা করা যাবে না। গেঁটেব্যথা এতটাই মারাত্মক হতে পারে যে, অনেক রোগী স্বাভাবিক হাঁটাচলাতেও কষ্ট পান।

সেমিনারে ‘ডেঙ্গু গাইডলাইন ২০২৫: হোয়াট হ্যাজ চেঞ্জড’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হাসান। তিনি ডেঙ্গুর চিকিৎসায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন, যা আমাদের সকলের জানা থাকা উচিত। তিনি অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক, স্টেরয়েড এবং ভুল ঘরোয়া প্রতিকার ব্যবহারের পরিবর্তে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার গ্রহণ এবং প্যারাসিটামল ব্যবহারের ওপর জোর দেন।

ডা. মো. নাজমুল হাসান বলেন, ডেঙ্গুজ্বরের হালকা উপসর্গ যেমন; ৩ থেকে ৫ দিনের জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরে ব্যথা থাকলে রোগীকে হাসপাতালে না নিয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা করা সম্ভব। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং প্রচুর তরল পানীয়, যেমন: স্যালাইন, ফলের রস, স্যুপ – এগুলো পান করাতে হবে।

জ্বর কমাতে শুধু প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যাবে, যার দৈনিক সর্বোচ্চ মাত্রা ৩ গ্রাম। তিনি বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন: অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন এবং অন্যান্য ব্যথানাশক জাতীয় ওষুধ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ! এসব ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং রোগীর জীবন বিপন্ন করতে পারে।

ডা. নাজমুল হাসান আরও সতর্ক করে বলেন, স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ যেমন ডেক্সামেথাসন ও হাইড্রোকরটিসন ডেঙ্গু রোগীর জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। এসব ওষুধ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে এবং ফুসফুসে পানি জমার ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ওষুধ ডেঙ্গু চিকিৎসায় কার্যকর নয়, বরং কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে।

তবে, রোগীর জ্বর কমে যাওয়ার পর যদি হঠাৎ শরীর খারাপ বোধ করে, বারবার বমি হয়, পেটে তীব্র ব্যথা দেখা দেয়, রক্তপাত শুরু হয় (যেমন মাড়ি বা নাক থেকে রক্ত পড়া, কালো মল), দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হওয়া, মাথা ঘোরা বা চামড়া মলিন হয়ে আসে – তাহলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। এগুলো ডেঙ্গুর বিপজ্জনক লক্ষণ।

ডেঙ্গু রোগীদের রক্তের প্লাটিলেট বাড়ানোর ঘরোয়া পদ্ধতি হিসাবে পেঁপে পাতার রস ব্যবহারের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই বলে ডা. নাজমুল হাসান স্পষ্ট জানিয়েছেন। এমনকি, পেঁপে পাতার রস অতিরিক্ত বা ভুল মাত্রায় গ্রহণ করলে বমি, পেটব্যথা এমনকি লিভারের সমস্যাও সৃষ্টি হতে পারে।

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার পাশাপাশি এবার বাড়ছে করোনার উদ্বেগ। সেমিনারে জানানো হয়, বর্তমানে করোনা রোগীরা মূলত ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের অন্তর্গত জেএন.১ সাব-ভ্যারিয়েন্টের দুটি শাখা এক্সএফজি ও এক্সএফসি দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই ভ্যারিয়েন্টগুলোকে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন’ না বলে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব মনিটরিং’ হিসাবে তালিকাভুক্ত করেছে। অর্থাৎ এদের বিষয়ে নজরদারি প্রয়োজন হলেও, এখন পর্যন্ত এগুলোর কারণে ভয়াবহ জটিলতা দেখা যাচ্ছে না। তবে, সতর্ক থাকাটা জরুরি। জ্বর, সর্দি, কাশি হলে কোভিড পরীক্ষা করানো উচিত এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলা উচিত।

Exit mobile version