Site icon dbarta24.com

বিশ্বে বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় আরও তলানিতে ঢাকা!

খায়রুল আলম: প্রতি বছরই এই সময়টায় একটি খবর আমাদের নগরবাসীর মনে এক ধরনের হতাশা তৈরি করে। খবরটা হলো, বিশ্বের বসবাসযোগ্য শহরের তালিকা। আর এবারের তালিকাটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার জন্য নিয়ে এসেছে আরও একটি দুঃসংবাদ।

বিশ্বের বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় তিন ধাপ পিছিয়েছে ঢাকা! ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ২০২৫ সালের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে বাংলাদেশের এই রাজধানী শহর এখন ১৭১তম অবস্থানে রয়েছে।

ভাবতে অবাক লাগে, বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে আমাদের ঢাকা এখন প্রায় তলানিতে! এই তালিকার একদম নিচে, অর্থাৎ ১৭৩তম অবস্থানে রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক। আর তার ঠিক আগেই, ১৭২তম অবস্থানে আছে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি। অর্থাৎ, ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে কম বসবাসযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে তৃতীয় স্থানে। ঢাকার আগে ১৭০ ও ১৬৯তম অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে পাকিস্তানের করাচি ও আলজেরিয়ার আলজিয়ার্স।

ইআইইউ, অর্থাৎ ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, বিশ্বের বড় শহরগুলোর জীবনমান পরিমাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে এই সূচক প্রকাশ করে। তারা প্রতি বছর পাঁচটি প্রধান মানদণ্ডে বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মূল্যায়ন করে। এই মানদণ্ডগুলো হলো:

১. স্থিতিশীলতা (Stability)
২. স্বাস্থ্যসেবা (Healthcare)
৩. সংস্কৃতি ও পরিবেশ (Culture & Environment)
৪. শিক্ষা (Education)
৫. অবকাঠামো (Infrastructure)

তাহলে চলুন, দেখে নেওয়া যাক, ১৭১তম অবস্থানে থাকা ঢাকার স্কোর কেমন? মোট ৪১.৭ পয়েন্ট নিয়ে ঢাকা এই অবস্থানে রয়েছে। এর পাঁচটি মানদণ্ডের স্কোরগুলো খুবই হতাশাজনক:
• স্থিতিশীলতা: ৪৫ (১০০ এর মধ্যে) – রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ঢাকার পরিস্থিতি এখনো ভালো নয়।
• স্বাস্থ্যসেবা: ৪১.৭ – চিকিৎসার মান, হাসপাতাল সুবিধা, স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা – সবকিছুতেই বড় ঘাটতি রয়েছে।
• সংস্কৃতি ও পরিবেশ: ৪০.৫ – বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, সবুজ স্থানের অভাব, বিনোদনের সুযোগের অভাব – এই ক্ষেত্রগুলোতে ঢাকা অনেক পিছিয়ে।
• শিক্ষা: ৬৬.৭ – শিক্ষাব্যবস্থায় কিছুটা উন্নতি হলেও, বিশ্বমানের তুলনায় এটি এখনও অনেক দূরে।
• অবকাঠামো: ২৬.৮ – এটিই ঢাকার সবচেয়ে দুর্বল দিক। রাস্তাঘাট, পরিবহন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন – সবকিছুতেই চরম অব্যবস্থাপনা ও দুর্বলতা চোখে পড়ে।

বিশেষ করে অবকাঠামোতে মাত্র ২৬.৮ পয়েন্ট পাওয়াটা ঢাকার জন্য এক বিরাট লজ্জার বিষয়। একটি আধুনিক রাজধানীর জন্য এটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
এবার চলুন, আমরা দেখি এই তালিকার শীর্ষস্থানগুলো কারা দখল করে আছে। এবারের তালিকায় সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের শীর্ষে উঠে এসেছে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন। এর আগে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা টানা তিন বছর শীর্ষ অবস্থানে ছিল, কিন্তু এবার কোপেনহেগেন তাকে ছাড়িয়ে গেছে।

কোপেনহেগেন স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো ও শিক্ষায় পূর্ণ ১০০ নম্বর পেয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবায় ৯৫.৮ এবং সংস্কৃতি ও পরিবেশে ৯৫.৪ স্কোর করেছে। সব মিলিয়ে শহরটির মোট স্কোর দাঁড়িয়েছে ৯৮। এই শহরগুলো যে কেবল অর্থনৈকভাবে শক্তিশালী তা নয়, বরং তাদের নাগরিকরা কতটা শান্তিতে ও স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারে, তারও একটি দারুণ উদাহরণ। পরিষ্কার বাতাস, সুপরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং পর্যাপ্ত সবুজ স্থান – এগুলোই একটি বাসযোগ্য শহরের মূল বৈশিষ্ট্য।

তাহলে চলুন, আমরা দেখে নিই ২০২৫ সালে বিশ্বের ১০টি সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর কোনগুলো:
১. কোপেনহেগেন, ডেনমার্ক
২. ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া
৩. জুরিখ, সুইজারল্যান্ড
৪. মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া
৫. জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
৬. সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
৭. ওসাকা, জাপান
৮. অকল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড
৯. অ্যাডিলেড, অস্ট্রেলিয়া
১০. ভ্যাঙ্কুভার, কানাডা

এই তালিকাটি দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, পশ্চিম ইউরোপের শহরগুলোই মূলত তালিকার শীর্ষস্থানগুলো দখলে রেখেছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান ও কানাডার শহরগুলোও ভালো অবস্থানে আছে। এগুলো এমন সব শহর যেখানে নাগরিকরা সত্যিই উচ্চমানের জীবনযাপন উপভোগ করেন।

আর এবার দেখে নিন ২০২৫ সালে বিশ্বের ১০টি সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহর কোনগুলো, যেখানে দুর্ভাগ্যবশত আমাদের ঢাকার নামও রয়েছে:

১. দামেস্ক, সিরিয়া (সবচেয়ে নিচে)
২. ত্রিপোলি, লিবিয়া
৩. ঢাকা, বাংলাদেশ
৪. করাচি, পাকিস্তান
৫. আলজিয়ার্স, আলজেরিয়া
৬. লাগোস, নাইজেরিয়া
৭. হারারে, জিম্বাবুয়ে
৮. পোর্ট মোরেসবি, পাপুয়া নিউ গিনি
৯. কিয়েভ, ইউক্রেন
১০. কারাকাস, ভেনেজুয়েলা

এই তালিকাটা দেখলেই বোঝা যায়, নিচের দিকের শহরগুলো দখল করে আছে মূলত যুদ্ধ ও সংকটে থাকা মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার শহরগুলো। এর মধ্যে ঢাকা ও করাচির মতো শহরগুলোর অবস্থান সত্যিই উদ্বেগজনক। যুদ্ধ না থাকা সত্ত্বেও আমাদের রাজধানীর এই করুণ দশা আমাদের নগর পরিকল্পনাবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করে।

তাহলে কেন ঢাকা এমন একটি অবস্থানে রয়েছে? এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:

• অপরিকল্পিত নগরায়ন: দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সে অনুযায়ী অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, সরু রাস্তাঘাট, এবং অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়েছে।
• যানজট: ঢাকা বিশ্বের অন্যতম যানজটপূর্ণ শহর। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে নগরবাসীর কর্মক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এই যানজট কেবল সময় নষ্ট করছে না, এটি অর্থনৈতিক ক্ষতিও করছে।
• পরিবেশ দূষণ: বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ঢাকার পরিবেশকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। বিশেষ করে শীতকালে ঢাকার বায়ুর মান বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম থাকে।
• দুর্বল স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা: সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতেই মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতা ও গুণগত মানের প্রশ্ন ঢাকার জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
• নিরাপত্তাহীনতা: ছিনতাই, চাঁদাবাজি, এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যকলাপ নাগরিক জীবনে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। স্থিতিশীলতার কম স্কোর এরই প্রতিফলন।
• জলাবদ্ধতা: বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকা শহরের অনেক এলাকা পানিতে ডুবে যায়, যা নাগরিক জীবনে দুর্ভোগের কারণ হয়। দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এর জন্য দায়ী।

এই র‍্যাঙ্কিং কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের জন্য একটি আয়না। এটি আমাদের দেখিয়ে দেয় যে, একটি বাসযোগ্য শহর হিসেবে ঢাকা কতটা পিছিয়ে আছে এবং আমাদের সামনে কতটা পথ বাকি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সকল নাগরিকের সচেতন অংশগ্রহণ। শুধু নীতিনির্ধারকদের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না, আমাদের নিজেদেরও সচেতন হতে হবে।

Exit mobile version