Site icon dbarta24.com

বিশ্ব শরণার্থী দিবস ২০২৫:প্রত্যাশার শেষ কোথায়

২০ জুন ২০২৫ পালিত হয় বিশ্ব শরণার্থী দিবস, এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শরণার্থীদের সঙ্গে সংহতি’। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানায়, ২০২৪ সালের শেষে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা পৌঁছায় ১২২.১ মিলিয়নে, যার মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। বাংলাদেশে তাদের খাদ্য সংকট বেড়েছে, রেশন কমে এসেছে। মিয়ানমারে চলমান সংঘাতে প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা হুমকির মুখে। শরণার্থীদের টেকসই ভবিষ্যতের জন্য জরুরি সহায়তা ও তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

ড:মিহির কুমার রায়ঃ   ২০ জুন,২০২৫ ছিল বিশ্ব শরণার্থী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য—‘শরণার্থীদের সঙ্গে সংহতি’— অর্থাৎ শুধু কথায় নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর উদ্যোগে ২০০১ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ওই দিনটিকে বাছাই করার পেছনে ২০০১ সালে শরণার্থীদের অবস্থা সম্পর্কিত ১৯৫১ সালের কনভেনশনটির ৫০ বছর পূর্তি হওয়ার বিষয়টিও কাজ করেছে। অন্যদিকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পালিত হওয়া আফ্রিকান শরণার্থী দিবসটিও পরবর্তীকালে ২০ জুন তারিখে বিশ্ব শরণার্থী দিবস হিসেবেই পালনের সিদ্ধান্ত হয়। মূলত বিশ্ব শরণার্থী দিবস শরণার্থীদের শক্তি ও সাহসকে সম্মান করে এবং সংঘাত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তাদের জন্মভূমি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়া শরণার্থীদের জনসচেতনতা ও সমর্থনকে উৎসাহিত করে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা বলছে, ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২২ দশমিক ১ মিলিয়ন, যা রেকর্ড পরিমাণ। এর মধ্যে ৪২ দশমিক ৭ মিলিয়ন মানুষ আন্তর্জাতিক শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃত, বাকিরা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ও আশ্রয়প্রার্থী। সুদান, মিয়ানমার, ইউক্রেনসহ বিভিন্ন সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলের সংকট পরিস্থিতি এ সংখ্যা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ইউএনএইচসিআর-এর হাই কমিশনার ফিলিপো গ্রান্ডি এক বার্তায় বলেছেন, শরণার্থীদের সম্মান জানানোর অর্থ শুধু তাদের সম্পর্কে কথা বলা নয়, বরং তাদের কথা শোনা, অধিকার রক্ষা করা এবং তাদের জন্য টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ সৃষ্টি করা।দেশের অভ্যন্তরে এবং বাইরে মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছে সিরিয়ায় (এক কোটি ৩৮ লাখ)। যেসব দেশের সবচেয়ে বেশি শরণার্থী রয়েছে, সেগুলো হলো ভেনিজুয়েলা (৬২ লাখ), সিরিয়া (৬০ লাখ), আফগানিস্তান (৫৮ লাখ), ইউক্রেন (৫১ লাখ) ও দক্ষিণ সুদান (২৩ লাখ)। এই পাঁচটি দেশের শরণার্থীরা বিশ্বের মোট শরণার্থীর ৬৯ শতাংশ। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে জোর করে তাদের ভিটামাটি থেকে দেশছাড়া করেছে।  দেখা গেছে, এই বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য মতে, সবচেয়ে বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া পাঁচটি দেশ হলো ইরান (৩৫ লাখ), তুরস্ক (৩৩ লাখ), কলম্বিয়া (২৮ লাখ), জার্মানি (২৭ লাখ) ও উগান্ডা (১৮ লাখ)। বিশ্বের মোট শরণার্থীর ৩৭ শতাংশই অবস্থান করছে এই পাঁচটি দেশে। যে নামেই সংজ্ঞায়িত করি না কেন, প্রায় ১২ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে মালয়েশিয়ায়ও কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় লাভ করেছে। মোট শরণার্থীর ৪০ শতাংশ শিশু ছাড়াও ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আরো প্রায় ২৩ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে শরণার্থী হিসেবে।

বাস্তুচ্যুতির মুখ্য কারণ এবং বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নিরাপদ গন্তব্যে আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করে দেখা গেছে যে  গত দশকে বিশ্বব্যাপী শরণার্থী জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে;  শরণার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে (মোট শরণার্থীর ৬৭ শতাংশ);  বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা অসামঞ্জস্যপূর্ণ;  নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বেশির ভাগ শরণার্থী (মোট শরণার্থীর ৭৩ শতাংশ) আশ্রয় নিয়েছে এবং  জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির প্রধান কারণ হলো সংঘাত (রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা জাতিগোষ্ঠীগত) এবং সেসব থেকে উদ্ভূত নির্যাতন ও নিপীড়ন।এ ক্ষেত্রে তাদের প্রত্যাবাসনে মূলত দুটি প্রতিবন্ধকতার উদ্ভব ঘটে—তাদের নিজ দেশের সরকারের তাদের ফেরত নিতে অনিচ্ছা এবং প্রত্যাবাসনের জন্য তাদের দেশে নিরাপদ অবস্থা বিরাজ না করা। অনেক সময় সেখানে নিরাপদ অবস্থা বিরাজ করলেও সরকার ফেরত নিতে চায় না বা নানা অজুহাতে আলাপ-আলোচনা দীর্ঘায়িত করে। এ ক্ষেত্রে ওই দেশকে তাদের নাগরিকদের ফেরত নিতে জাতিসংঘ বা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থা বাধ্য করতেও পারে না।

এখন আসা যাক বাংলাদেশ প্রসঙ্গে যেখানে বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি। কক্সবাজারের কুতুপালং এবং নয়াপাড়া ক্যাম্পে তাদের অধিকাংশের বসবাস। এছাড়া ভাসানচরে প্রায় ৩৫ হাজার রোহিঙ্গাকে স্থানান্তর করা হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস চলতি বছর মার্চে কক্সবাজার সফরে এসে বলেন, এই মানুষগুলো শুধু টিকে থাকার জন্য লড়ছে। আমরা যদি এখনই সাহায্য না করি, তাহলে তারা সত্যি সত্যিই অনাহারে মারা পড়বে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সহায়তার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু সহানুভূতি নয়, এখন দরকার বাস্তব সহায়তা।সাত বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কার্যকরণে রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে আরোপিত পাঁচটি শর্তকে মোটেও আমলে নেওয়া হচ্ছে না। উপরন্তু ২০২৪ সালের শুরু থেকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও রাখাইনে আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ চলমান থাকায় রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ২০২৩ সালে ডিসেম্বর মাসে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য যে পাইলট প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল তাও থেমে যায়। মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসার কোনো লক্ষণ অনুভূত নয়। তাই রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। অতিসম্প্রতি জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জরুরি তহবিলের অভাবে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্য রেশন কমিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে। সংস্থাটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তি মারফত জানা যায়, রোহিঙ্গাদের জন্য পূর্ণ রেশন চালিয়ে যেতে এপ্রিলে ১৫ মিলিয়ন ডলার এবং বছরের শেষ পর্যন্ত মোট ৮১ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। এ মাসের মধ্যে ১৫ মিলিয়ন ডলারের অর্থ সহায়তা জোগাড় করতে না পারলে ১ এপ্রিল থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য খাবারের বরাদ্দ অর্ধেক কমানো হতে পারে। বর্তমানে একজন রোহিঙ্গা মাসে ১২ দশমিক ৫০ ডলার মূল্যের খাদ্য সহায়তা পেয়ে থাকে, যা কমিয়ে ৬ ডলারে আনা হবে। ফলে প্রতি বেলার খাবারের জন্য বরাদ্দ বাংলাদেশী মুদ্রায় ১৬ টাকা থেকে কমে হবে ৮ টাকা। এতে আগে থেকেই বিরাজিত খাদ্য সংকট এবং অপুষ্টি আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। প্রাসঙ্গিকতায় ডব্লিউএফপির বাংলাদেশ মুখপাত্র কুন লি গণমাধ্যমে বলেন, ‘মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে অনুদান সংকটের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোহিঙ্গাদের জন্য অনুদান কমে আসছে। এর আগে ২০২৩ সালে তহবিল ঘাটতিতে রোহিঙ্গাদের মাথাপিছু মাসিক খাদ্য সহায়তা ১২ মার্কিন ডলার থেকে কমিয়ে প্রথমে ১০ মার্কিন ডলার হয়

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনও তেমনি মায়ানমার সরকারের টালবাহানার শিকার হয়ে অনিশ্চিত হয়ে আছে। সর্বোপরি, মায়ানমারে সামরিক সরকার ক্ষমতা দখলের পর এবং বর্তমানে মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন অনিরাপদ বিধায় বিষয়টি অনেকটাই স্থবির হয়ে গেছে। এদিকে, রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনায় ২০২৫ সালের জন্য প্রায় ৯৩৪ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যার অর্ধেকেরও কম এখনো জোগাড় হয়েছে। এই তহবিলের ঘাটতির কারণে খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক সেবাগুলো হুমকির মুখে। বিশ্বজুড়ে যখন বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, তখন মানবিক সহায়তার জন্য তহবিল সংকট প্রকট হচ্ছে। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, অনেক জরুরি প্রকল্প অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও নারী শরণার্থীরা। শরণার্থীদের যেন দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তুচ্যুত হয়ে থাকতে না হয়, তা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা দরকার। খুব কমসংখ্যক শরণার্থীকে তাদের নিজ দেশে ফিরতে দেখা যায়। তাই শরণার্থীরা যাতে তাদের নিজ দেশে তাড়াতাড়ি প্রত্যাবাসনের সুযোগ পায় সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। যেহেতু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোই বেশির ভাগ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, তাই তাদের ওপর থেকে চাপ কমাতে বিকল্প চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। প্রয়োজনে তৃতীয় দেশে, বিশেষ করে যেসব উন্নত দেশে লোকবলের চাহিদা রয়েছে, সেখানে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক (অর্থনীতি),সাবেক পরিচালক,বার্ড (কুমিল্লা) ,সাবেক ডিন (ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ) ও সিন্ডিকেট সদস্য,সিটি ইউনিভার্সিটি,ঢাকা  ও এলকপ মনোনীত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষন টিমের সদস্য ।

 

Exit mobile version