খায়রুল আলম: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যে ভয়াবহ সংঘাত চলছিল, তার আপাত অবসান হয়েছে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে। কিন্তু এই যুদ্ধবিরতি কি সত্যিই শান্তি ফিরিয়ে এনেছে? পরিস্থিতি যতটা শান্ত দেখাচ্ছে, পর্দার আড়ালে কি তা ততটাই স্বাভাবিক? আজ আমরা যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি, তার প্রভাব এবং উভয় দেশের ভেতরের চিত্র তুলে ধরব, যা আপনাদের ভাবিয়ে তুলবে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও, ইরানের একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইসরায়েলিদের ক্ষয়ক্ষতি কিন্তু কম হয়নি। এর মাশুল গুণতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এই হামলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩৯ হাজার ইসরায়েলি এখন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইছেন। মঙ্গলবার ২৪ জুন তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে এই চাঞ্চল্যকর খবরটি জানিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমটি আরও জানিয়েছে যে, ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ইসরায়েলের কর কর্তৃপক্ষ একটি ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করেছে। গত ১৩ জুন ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে এই তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মোট ৩৮ হাজার ৭০০টি আবেদন জমা পড়েছে! সংখ্যাটা সত্যিই বিশাল।
কী ধরনের ক্ষতির জন্য এই আবেদনগুলো জমা পড়েছে?
- ৩০ হাজার ৮০৯টি আবেদন এসেছে ঘরবাড়ি ও ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে। কল্পনা করুন, হাজার হাজার পরিবার তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়েছে বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- ৩ হাজার ৭১৩টি আবেদন জমা পড়েছে যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার কারণে। অনেক মানুষের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন এই যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল।
- আর ৪ হাজার ৮৫টি আবেদন এসেছে যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য জিনিস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে। অর্থাৎ, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ইসরায়েলি ওয়েবসাইট বেহাদ্রেই হারেদিম-এর তথ্যমতে, শুধু তেল আবিবেই ক্ষতিপূরণ চেয়ে ২৪ হাজার ৯৩২টির বেশি আবেদন জমা পড়েছে। তেল আবিব ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান শহর এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্র, যেখানে এত বিপুল সংখ্যক ক্ষতির আবেদন ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানের হামলা কতটা ব্যাপক ছিল। এছাড়া, দক্ষিণাঞ্চলের আশকেলন শহরে আবেদন জমা পড়েছে ১০ হাজার ৭৯৩টি।
যদিও এত বিপুল সংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে, ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ইসরায়েলিদের কী পরিমাণে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। এই ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত হবে, তা নিয়েও রয়েছে জনমনে প্রশ্ন।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের হামলায় নিহত ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার ও শীর্ষ বিজ্ঞানীদের জন্য এক শোকাবহ ঘোষণা এসেছে। তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা আগামী শনিবার রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত হবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে টিআরটি ওয়ার্ল্ড এ খবর জানিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক দিন পর আজ বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ১২ দিন ধরে চলা ইহুদি রাষ্ট্রের আগ্রাসনে শহীদ কমান্ডার ও বিজ্ঞানীদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা আগামী শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে রাজধানী তেহরানে শুরু হবে। এটি ইরানের জনগণের কাছে তাদের শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি বড় সুযোগ।
এই সংঘাতের সূত্রপাত হয় গত ১৩ জুন, যখন ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়। জবাবে ইসরায়েলে পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান। এই পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই ২১ জুন যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাব দেয় ইরান। পরদিন ২৩ জুন কাতারের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নিশানা করে ইরান হামলা চালায়। টানা ১২ দিন ধরে চলা এই সংকটের মধ্যে হঠাৎ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যা গতকাল মঙ্গলবার কার্যকর হয়েছে।
সংঘাতে ইসরায়েল দাবি করেছে যে, তারা ইরানের অন্তত ১৪ জন বিজ্ঞানীকে হত্যা করেছে। ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাও। এই হত্যাকাণ্ডগুলো নিঃসন্দেহে ইরানের ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে।
সংঘাতের পাশাপাশি, ইরানের ভেতরে ইসরায়েলি গুপ্তচরবৃত্তি নিয়েও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করার সন্দেহে ইরানের খুজেস্তান প্রদেশে ২৩ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম এই তথ্য প্রকাশ করেছে, যা আল জাজিরাতেও প্রচারিত হয়েছে।
তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরাক সীমান্তঘেঁষা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর আহভাজের সরকারি কৌঁসুলিরা এই ২৩ ব্যক্তির বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড’ এবং ‘শত্রুর পক্ষে তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার চালানোর’ মতো গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। যদিও স্বাধীন গণমাধ্যম বা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এসব অভিযোগ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তবে এর আগেও, আজ বুধবার তাসনিমের খবরে বলা হয়, উরমিয়া অঞ্চলে সরকারের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আরও তিন ব্যক্তিকে ফাঁসি দিয়েছে ইরান। এ নিয়ে গত ১৩ জুন ইরানে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে অন্তত ৬ জনকে ফাঁসি দিয়েছে তেহরান। ইরানের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করার সন্দেহে গত ১২ দিনে অন্তত ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটি এক চরম উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নির্দেশ করে, যেখানে নিরাপত্তা এবং মানবাধিকার উভয়ই প্রশ্নের মুখে।
ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় ২২ জুন ভোরে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন কক্ষে বসে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে হামলা পর্যবেক্ষণ করেন। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ট্রাম্পের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পায়।
তবে হামলার জবাব দিতে পিছপা হয়নি ইরানও। এক দিনের মধ্যে উপসাগরীয় দেশ কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তেহরান। পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের উদ্যোগে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিন ধরে চলা সংঘাতের আপাতত লাগাম টানা হয় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে।
কিন্তু ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে হঠাৎ যুক্তরাষ্ট্রের হামলা চালানোর ঘটনা বেশিরভাগ মার্কিন নাগরিকই সমর্থন করছেন না। সিএনএন/এসএসআরএস-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে এই মনোভাব উঠে এসেছে। কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলার আগে এই জরিপটি করা হয়েছে।
জরিপে প্রশ্ন ছিল, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ সমর্থন করেন কি না? জবাবে জরিপে অংশ নেওয়া ৫৬ শতাংশ মার্কিন বলেছেন, তাঁরা এটা সমর্থন করতে পারছেন না। আর হামলার পক্ষে রয়েছেন মাত্র ৪৪ শতাংশ মার্কিন। যদিও ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের মধ্যে ৮২ শতাংশ সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে, অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক দলের ৮৮ শতাংশ মনে করেন, এই পদক্ষেপ সমর্থনযোগ্য নয়। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট করে তোলে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৫৮ শতাংশ মার্কিন বলছেন, ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরান আরও বড় হুমকি হয়ে উঠবে। মাত্র ১৫ শতাংশ মনে করছেন, ইরান বড় হুমকি হবে না। ৮৫ শতাংশ ডেমোক্র্যাট মনে করছেন, ইরান আরও বড় হুমকি হয়ে উঠবে। রিপাবলিকানদের মধ্যে এ হার ৩০ শতাংশ।
এছাড়াও, ইরানে হামলা চালিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এমনটা মনে করছেন জরিপে অংশ নেওয়া মাত্র ২২ শতাংশ মার্কিন। ২৩ শতাংশ মাঝামাঝি বা নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছেন। অন্যদিকে ৩৮ শতাংশ মনে করছেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। রিপাবলিকানদের মধ্যে ৫১ শতাংশ মনে করছেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সঠিক, যেখানে ডেমোক্র্যাটদের ৭১ শতাংশের মতে, ট্রাম্প সঠিক সিদ্ধান্ত নেননি। এই জরিপগুলো স্পষ্টতই দেখায় যে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ নিয়ে মার্কিন জনগণের মধ্যে বড় ধরনের বিভেদ রয়েছে।
যুদ্ধবিরতি হয়তো সামরিক সংঘাত সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে, কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উভয় দেশেই স্পষ্ট। ইসরায়েল একদিকে যেমন বিপুল সংখ্যক ক্ষতিপূরণের আবেদন সামলাচ্ছে, অন্যদিকে ইরান গুপ্তচরবৃত্তির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলেও এই পদক্ষেপগুলোর প্রতিক্রিয়া মিশ্র।
মধ্যপ্রাচ্যের এই জটিল পরিস্থিতি ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেয়, তা বলা মুশকিল। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, এই সংঘাতের মূল্য উভয় পক্ষকেই চোকাতে হচ্ছে, এবং এর রেশ সম্ভবত দীর্ঘকাল ধরে চলবে।

