Site icon dbarta24.com

ইরান না ইসরায়েল, কে জিতল? পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের চাল!

খায়রুল আলম: মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন যুদ্ধের কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হচ্ছিল, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক সংঘাত যখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছিল, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। মনে হয়েছিল, পরিস্থিতি এক নতুন দিকে মোড় নেবে।

কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণ আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে এক ভিন্ন চিত্র, যা উন্মোচন করেছে পর্দার আড়ালে ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর ঘটনাপ্রবাহ। এই সংঘাতে শেষ পর্যন্ত কে জিতল? ইরান, ইসরায়েল, নাকি যুক্তরাষ্ট্র? আজ আমরা সেটাই বিশদভাবে জানব।

আপনারা জানেন, সম্প্রতি কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। কিন্তু এই হামলা এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতার চেষ্টার আগেই ইরান উত্তরণের একটি পথ খুঁজছিল।

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত সোমবার সকালে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ নিয়ে আলোচনার জন্য জরুরি বৈঠক করে। ইসরায়েলি হামলার পর ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলা তেহরানের সামরিক নেতৃত্ব ও অবকাঠামোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল বলে ধারণা করা হয়েছিল।

এই অবস্থায় ইরানের জন্য আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছিল। যুদ্ধ পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত চারজন ইরানি কর্মকর্তার মতে, একটি বাংকারের ভেতর থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি পাল্টা আক্রমণের নির্দেশ দেন। তবে একই সঙ্গে তিনি একটি নিয়ন্ত্রিত হামলার নির্দেশ দেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়ানো যায়। এটি ছিল একটি অত্যন্ত সতর্কতাপূর্ণ পদক্ষেপ, যা নির্দেশ করে যে ইরান বড় আকারের সংঘাতে জড়াতে চায়নি। তাদের লক্ষ্য ছিল পাল্টা জবাব দেওয়া, কিন্তু পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে না দেওয়া।

ইরান এই অঞ্চলে একটি মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে চেয়েছিল, তবে যুক্তরাষ্ট্রও আরও আক্রমণ প্রতিরোধে আগ্রহী ছিল। তাই হামলার জন্য ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি বেছে নেয় দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে।

আইআরজিসির দুই সদস্যের মতে, প্রথমত, এটি এই অঞ্চলের বৃহত্তম মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, তাই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার সমন্বয়ে এর সংশ্লিষ্টতা ছিল। এর মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রে আঘাত হানতে চেয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, যেহেতু এটি ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র কাতারে অবস্থিত, তাই ইরানি কর্মকর্তারাও বিশ্বাস করেছিলেন যে ক্ষয়ক্ষতি মোটামুটি কম রাখা যেতে পারে। এটি ছিল এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার প্রচেষ্টা। তারা শক্তি প্রদর্শন করতে চেয়েছিল, কিন্তু নিজেদের মিত্রদেরও বিপদে ফেলতে চায়নি।

হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আগাম নোটিশ পাঠাতে শুরু করে যে একটি হামলা আসন্ন। অর্থাৎ, ইরান একটি বার্তা দিতে চেয়েছিল যে তারা হামলা করছে, কিন্তু হতাহত চায় না। কাতার তাৎক্ষণিকভাবে তার আকাশসীমা বন্ধ করে দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করা হয়। এটি ছিল এক অসাধারণ কূটনৈতিক কৌশল, যা সম্ভাব্য প্রাণহানি এড়াতে সাহায্য করেছিল।

এক টেলিভিশন ভাষণে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন, “কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমণ পরিচালনা করেছে আইআরজিসি।

আমরা শত্রুদের সতর্ক করছি যে আঘাত করে পালিয়ে যাওয়ার যুগ শেষ হয়ে গেছে।” এই বক্তব্য একদিকে যেমন জনগণের কাছে তাদের দেশপ্রেম ফুটিয়ে তোলে, তেমনি আন্তর্জাতিক মহলেও একটি দৃঢ় বার্তা পৌঁছে দেয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ফুটেজ প্রচারের সময় উপস্থাপকরা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ইরানের গৌরব ও বিজয়ের কথা বলতে থাকেন, যা অভ্যন্তরীণভাবে জনগণের মনোবল বাড়ানোর একটি প্রচেষ্টা ছিল।

কিন্তু চার ইরানি কর্মকর্তা জানান, ইরানি নেতারা আশা করেছিলেন যে তাঁদের সীমিত আক্রমণ এবং আগাম সতর্কবার্তায় ট্রাম্প পিছু হটতে বাধ্য হবেন এবং ইরানও একই পথে হাঁটবে। তারা আশা করেছিলেন, ওয়াশিংটন ইরানের ওপর বিমান হামলা বন্ধ করতে ইসরায়েলকে চাপ দেবে।

কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার আগে ইরানের এক কর্মকর্তা বলেন, পরিকল্পনা ছিল কোনো আমেরিকানকে হত্যা করা হবে না। কারণ কারো মৃত্যু হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশোধ নিতে পারে, যাতে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। আর এই পরিকল্পনাটি কার্যকর হয়েছিল বলেই মনে হচ্ছে।

এক বিবৃতিতে ট্রাম্প ইরানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আমাদের আগেভাগে জানানোর জন্য ধন্যবাদ। এর ফলে কেউ হতাহত হয়নি।” এর পরই ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি আসন্ন। যদিও গতকাল মঙ্গলবার সকালে তা কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়, যখন ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি না মানায় ইরান ও ইসরায়েল উভয়কেই সমালোচনা করেন।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান পরিচালক আলী ভায়েজ এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “যুদ্ধে জয়ী হওয়ার বয়ান প্রতিটি পক্ষেরই রয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়ানোর কথাও বিবেচনা করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র দাবি করতে পারে যে তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে পিছিয়ে দিয়েছে। ইসরায়েল বলতে পারে যে তারা আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ ইরানকে দুর্বল করে দিয়েছে এবং ইরান বলতে পারে যে তারা অনেক শক্তিশালী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে টিকে আছে এবং তাদের পিছু হটতে বাধ্য করেছে।”

অর্থাৎ, প্রত্যেকেই নিজেদের মতো করে এই সংঘাতে বিজয়ী হওয়ার দাবি করতে পারে। এটি একটি ‘Win-Win’ পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা ছিল, যেখানে কেউ পুরোপুরি পরাজিত হয়নি।

যুদ্ধের লাল রেখা হয়তো আরও আগেই অতিক্রান্ত হয়েছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ইরানের আগ্রহ ক্রমেই কমে আসছে। বেশিরভাগ ইরানি যুদ্ধকে তাদের দেশের ওপর আক্রমণ আখ্যা দিয়ে নিন্দা করেছে। এরই মধ্যে তেহরান ও অন্যান্য শহরে অনেকেই বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

দোকান, ব্যবসা ও সরকারি দপ্তর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে শুরু করায় অনেকেই বলছিল যে তারা বেশিদিন টিকতে পারবে না। ইরানের জনগণ, যারা দীর্ঘকাল ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার শিকার, তারা আরও একটি বড় সংঘাতের ধকল সইতে রাজি ছিল না।

তেহরানের জাতীয় উন্নয়ন দলের প্রধান সাদেঘ নরোউজি বলেন, “আমাদের এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। কারণ আমাদের অর্থনীতি ও জনসমর্থন বজায় রাখার সমস্যা আছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নেই।” তার এই মন্তব্য ইরানের বাস্তব পরিস্থিতিকেই তুলে ধরে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক করিম জাফারিও মনে করেন, ইরানের উচিত ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে মনোযোগ দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে না জড়ানো। তার মতে, পরিণতি বিবেচনা না করে একটি বৃহত্তর বহুমুখী যুদ্ধে জড়াতে চায়নি ইরান। এটি তাদের একটি সচেতন কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল।

ইরান এরপর যা করবে, তা এখনো একটি উন্মুক্ত প্রশ্ন। যদিও এই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে সীমিত আক্রমণ করে গভীর সংঘাত এড়ানোকে পরিকল্পিত মনে হচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে শত্রুতা শেষ হয়ে গেছে।

পশ্চিমা কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলা সত্ত্বেও তাঁরা নিশ্চিত নন যে ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুদের কী হয়েছে।

ইরান কি আরও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে? তারা কি আরও গোপন আগ্রাসনের চেষ্টা করবে? নাকি তারা এখন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য আলোচনার চেষ্টা করবে?

মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি বলছি না যে তারা ক্ষতি করেনি। হ্যাঁ, ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু তারা আমাদের পুরো ক্ষমতা কেড়ে নিতে অথবা অন্য কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।” তার এই বক্তব্য একদিকে যেমন ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে, তেমনি ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও তুলে ধরে।

নিউইয়র্ক টাইমসের এই বিশ্লেষণ আমাদের সামনে তুলে ধরেছে যে, ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে কেবল সামরিক শক্তিই নয়, কূটনৈতিক কৌশল এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এই সংঘাতে কেউ কি সত্যিই জয়ী হয়েছে, নাকি এটি কেবল একটি সাময়িক বিরতি? মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Exit mobile version